আইকার্ড (এক অসমাপ্ত প্রেমের গল্প) || Bengali short story ||


আইকার্ড 
                                           
বাসে ফিরতে ফিরতে আগের বছরের কথাগুলো মনে করছিলাম। এক বছর আগেই তো এই দিনটাতেই প্রথম বিয়ারের বোতলে মুখ ঠেকিয়েছিলাম। অনেকটা বড় হয়ে গেছিলাম সেদিন। শোভনের বাড়িতে আজ পুজো, আবার সেই আসর। এবারেও কথা দিয়েছি বিয়ারটা খাবো। হঠাৎ ফোনে ম্যাসেজ,

শোভনঃ আজ একটু তাড়াতাড়ি আসিস, কাজ আছে। ওটা সেরে বসবো।

আমি ছোট্ট একটা বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ফোনটা অফ করে দিলাম। সত্যি, একটা বুড়ো আঙ্গুলে কতকিছু কথা একবারে বোঝানো যায়। ফিরে গেলাম সেদিনের ঘটনাগুলোর কথা। একটা গোল বিছানাতে বসে সবাই যখন খাচ্ছিল, দ্বীপ বোতলটা মুখের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ ভাই, খেয়ে নে কিচ্ছু হবে না। ”
শুধু মাত্র কেমন খেতে, সেটা দেখার জন্যেই সেবার খেয়েছিলাম। বেশ কড়া খেতে ছিল। ওরা বলছিল, ঠাণ্ডা খেলে কিছু মনে হয় না, হেব্বি লাগে। আমি সায় দিলাম।

একথা ওকথা ভাবতে ভাবতে কখন কন্ডাক্টর আমার গন্তব্যের নাম ধরে চেঁচাল বুঝতে পারলাম না। পাশের একটা কাকুমার্কা লোক আমাকে ধাক্কা মারতে চোখে পড়ল যে এবার নামতে হবে।
বাস থেকে নেমে একটা অটো নিয়ে সোজা বাড়ি। প্রায় দেড়মাস পর বাড়ি ফিরলাম

দুপুরে খেয়ে দেয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই, ঘুম ভাঙল ফোনের রিংটোন শুনে। ১১টা মিসড কল!!!!!...... ঘুরিয়ে ফোন করতে অপাশ থেকে আওয়াজ এলো, “ এই যে বাবাজীবন, কখন আসছেন আপনি? গাড়ি পাঠাবো সালা! তাড়াতাড়ি আয় ”। আমার বলার আগেই ফোনটা কেটে দিল। আমি ঝটপট তৈরি হয়ে বাবা’র থেকে ৫০০টাকা ঝেড়ে বেরিয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় মিষ্টি কিনতে হবে, হাজার হোক পুজোতে যাচ্ছি তাই।

শোভনের বাড়ি গিয়ে দেখি শোভন নেই। কাকিমা’র হাতে প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে শোভন কে ফোন করলাম। ব্যাটা আজকেও ফোন সুইচ অফ রেখেছে। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে দেখলাম দ্বীপ, জিৎ আর নির্বাণ এসে হাজির।

প্রায় আধঘণ্টা পরে শোভনকে পাওয়া গেল। ব্যাটা আমাদের রাতের ব্যাবস্থা করতে গেছিল তাই কাউকে জানায়নি। দ্বীপ আসতে করে বলল, “ ভাই, পনির নিয়ে আসিস চাটটা ভালো জমবে। ”

রাত তখন ১০টা বাজবে হয়তো। নির্বাণ সবে বোতলটা খুলেছে হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। এত রাত্রে কে ফোন করতে পারে ভাবতে ভাবতে ফোনটা পকেট থেকে বের করতে করতেই দেখলাম কেটে গেল। ট্রু’কলারেও দেখালো না। আবার ফোন, বেশ কিছুক্ষন বাজার পর ফোনটা তুললাম।

-“হ্যালো ! ”

অপর দিক থেকে কোনো উত্তর এলো না বারতিনেকহ্যালোবলার পর ফোনটা দেখলাম নিজেই কেটে দিল আবার মিনিট পাঁচেক পর ফোন এত মহা ঝামেলা, এত রাত্রে ফোন করছে, দাবি কি! ফোনটা তুলে গালাগালি করতে যাবো হঠাৎ একটা মেয়েলি গলা কেউ বলল,

-“ আপনি যেখানে আছেন একটু সরে আসবেপ্লিজ?! ”

যাহ্বাবা! আমি সবার সাথে আছি এটা বুঝল কি করে?! উফফ, জিৎ অনেকক্ষণ ধরে বকে যাচ্ছে, সেটাই শুনতে পেয়েছে হয়তো আমি বেশি কিছু না বলে ওদের থেকে একটু দূরে সরে এলাম এরপরে আমাদের কথোপকথনটা ছিল ঠিক এরকম

-         হ্যাঁ, বলুন কে আপনি আর এত রাত্রে কি কারনে ফোন করেছেন ?”

-         “ আমি অবন্তিকা সেন। আপনি আমাকে চিনবেন না আসলে আজ বাসে আমি একটি আই-কার্ড খুজে পেয়েছি, তো সেখান থেকেই আপনার নাম্বারটা পেলাম সন্ধ্যে থেকে ফোন করার সময় পাইনি, তাই এখন বাড়ি এসে ফোন করছি দরকারি জিনিস তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটা নিয়ে যান

-         আই-কার্ড?!  কোথায়, কি ভাবে? আমি তো………”

পুরো কথা শেষ করতে দিলো না মেয়েটি তার আগেই বলল, “ আরে চিন্তা করছেন কেন? আপনার জিনিস ঠিক জায়গায় আছে আপনি নিশ্চিন্তে যা করছিলেন করুন এটা আমার নাম্বার, কাল ফোন করে নেবেন। কোথায় ওটা নিতে হবে বলে দেবো শুভ রাত্রি

            আমার পুরো রাতটা এরপর কি ভাবে কেটেছে সে আমিই জানি ১স্ট ইয়ারের কার্ড হারালে তাও রক্ষে ছিল, কিন্তু এ যে ARC CARD বিশাল ঝাড় খাবো যদি কিছু হয়ে যায় যাই হোক, চিন্তায় চার বোতল বিয়ার খেয়ে নিয়েছি বুঝতেই পারিনি  


ঘুম যখন ভাঙল, ঘড়ি তে তখন সাড়ে ৯টা রাতের ফোনটায় আবার ফোন লাগালাম এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, এত কিছু যে হয়ে গেছে নির্বাণ ছাড়া আর কেউ কিছু জানেনা প্রায় ১৫-২০ সেকেন্ড পর ওপার থেকে কাল রাতের গলাটা বলল,

-         আপনার ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলাম আসলে অন্যের জিনিস নিজের কাছে আছে তো, তার ওপর অপরিচিত তাই আর কি!”

-         কোথায় গিয়ে ওটা নিতে হবে জানান ওটা আমার খুব দরকার ” (বেশ কড়া গলাতেই বললাম কথা টা)

-         আপনি তো মহা বদ! আমি কি ওটা ফেলে দিচ্ছি, আপনার জিনিস ঠিক ফেরত দেবো বিকেল চারটেয় রিভারসাইডে পুরনো ঘাটের সামনে আমি দাঁড়াবো সময় করে চলে আসবেন

-         ধন্যবাদ বাকি কথা দেখা হলেই হবে

              ফোনটা কেটে দিলাম যাহ্‌! কিভাবে চিনবো কে উনি আবার ফোন করতে গিয়ে দেখলাম রিং হচ্ছে কিন্তু, কেউ তুলছেনা আবার করলাম, একই জিনিস বাধ্য হয়ে নাম্বার টা “UNKNOWN” বলে সেভ করে রাখলাম নোটিফিকেশানে একটা পপ-আপ ভেসে উঠলো

‘THIS NUMBER IS ON WHATSAPP’

ম্যাসেজ করলাম, “ আপনাকে চিনবো কি করে, অতো ভিড়ের মাঝে?!”
পাঁচ মিনিট পর রিপ্লাই পেলাম, “ পুরনো ঘাটে খুব একটা ভিড় থাকেনা তাছাড়া আপনাকে খুজতে হবে না আমিই খুঁজে নেবো

                     সারাদিন আর কোনো কথা হয়নি খুব টেনসানে কেটেছে পুরো দিনটা যতক্ষণ না জিনিসটা হাতে পাচ্ছি কিছুতেই যেন বসতে পারছিনা কলেজের আই-কার্ড ভাগ্য ভালো হারায়নি

সাড়ে তিনটে নাগাদ আমি বেরিয়ে গেলাম কাল বিকেলে সেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, এখনো বাড়ি ঢুকিনি, এই কাজটা সেরে একদম ঢুকবো যাহোক, সোয়া চারটে নাগাদ রিভারসাইডে পৌঁছে গেলাম পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে মুখে ঢুকিয়ে সবে ধরাতে যাবো, পেছন থেকে একজন ডেকে উঠলো, “আর্য মুখার্জী!
আমি পেছন দিকে ঘুরতেই দেখি, একটা মেয়ে সাদা চুড়িদার পরে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছুক্ষন ধরে মেয়েটাকে দেখেই গেলাম।

“নিন, ধরুন আপনার আইকার্ড। ”

আমি কার্ড টা নিয়ে মেয়েটার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটাও বোধয় একটু অপ্রস্তুতে পড়ে গেল, তাই সঙ্গে সঙ্গেই মুখ ঘুরিয়ে পেছন দিকে চলে গেল। যাওয়ার সময় একবার পেছনে তাকিয়ে চুলটা কানের পাশে সরিয়ে আবার মুখ ঘুরিয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিল। আমারও আর তাকে ধন্যবাদ জানানো হল না। জানিনা, কি হল মেয়েটার মুখ কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না। একটা নিস্পাপ সহজ সরল মুখ। চোখে কাজল, একটা ছোট্ট কালো টিপ।

এরপর বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। কলেজও খুলে গেছে। নতুন ফার্স্ট ইয়ারের ছেলে মেয়েরাও চলে এসেছে এখন। তো, সিনিয়ার হিসেবে যেটুকু কর্তব্য, কেউ যাতে ওদের র‍্যাগিং না করতে পারে তার খেয়াল রাখতে হবে। ভাগ্যিস, সেই কার্ড টা হারিয়ে যায়নি। তাই, কলেজ যাওয়ার আগে মনে করে কার্ড টা ব্যাগে নিয়ে কলেজ চললাম।

কলেজে তখন বাকি সবাই এসে গেছে। আমার সেকশানে ইন্ট্রো সেশান চলছে। আমি যথারীতি কার্ডটা কোমরে আটকে, দাদা-দাদা ভাব নিয়ে রুমে ঢুকে দেখতে লাগলাম সবাইকে। হঠাৎ করেই লক্ষ্য করলাম একটি মেয়েকে। খুব চেনা চেনা লাগলো, কিন্তু কথা বলতে সাহস হলো না। পাশে জ্যোতিপ্রিয়া দাঁড়িয়ে থাকায়, ওকে বললাম মেয়েটার ইন্ট্রো নিতে। মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে খুব হালকা ভাবে যে হেসে যাচ্ছে, সেটা আমি বেশ ভালো করেই বুঝতে পারলাম। জ্যোতিপ্রিয়া মেয়েটাকে নাম জিগ্যেস করতে যেটা শুনলাম সেটার জন্যে আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। মেয়েটাকে নাম জিগ্যেস করতে মেয়েটা বলেছিল,


“অবন্তিকা সেন”

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

পেন্ডিং || Bengali Short Story ||

ইন্টারভিউ || Bengali Short Story ||