পেন্ডিং || Bengali Short Story ||
গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেই সদ্য নতুন চাকরী জয়েন করেছে সৈকত।
সকাল ৯টার সময়ে বেরোয়ে, আবার রাত ৮টায় ফেরে। এভাবেই প্রায় মাস চারেক কাটার পরে একদিন সন্ধ্যেবেলা এ কথা সে কথা ভাবতে ভাবতে তার মনে হল,
এই ব্যস্ত জীবনে সে কোথাও না কোথাও নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। পুরনো সৈকত সাহা কে। যে প্রতি
সপ্তাহে দুটো করে গল্প লিখত নিয়মিত। কবিতা লিখত প্রতিদিন। কিন্তু, এখন এই জীবিকার টানে
সেসব বহুদিন হল বন্ধ। এসব ভাবতে ভাবতে হাতের সিগারেট এর জমে যাওয়া ছাই’টা অ্যাশ ট্রে
তে ফেলে আরেকটা টান দিলো। আজ খুব ইচ্ছে করছে একটা গল্প লেখার। কিন্তু, এতদিন পরে লিখতে
পারবে কি পারবে না এসব ভাবতে ভাবতেই হাতের সিগারেট টা শেষ করলো সে।
খানিকক্ষণ বসে কি লিখবে কি লিখবে ভাবতে ভাবতেই নিজের ল্যাপটপটা
খুলে কোলের ওপর রাখলো সৈকত। কিন্তু, কিছুতেই যেন কোনো বিষয় খুজে পাচ্ছিল না। কি নিয়ে
লিখবে। ঘড়ির কাঁটা দেখলো, তখন বাজে রাত আটটা । কিরকম যেন মাথা ধরে আসছে তার। চোখমুখে
একটা ক্লান্তির ছাপ। আজ যেন কিছুই ইচ্ছে করছে না। তবুও, জেদ যখন ধরেছে আজ সে লিখেই
ছাড়বে। কিন্তু কি লিখবে? লেখাগুলো যেন, পেনের ডগাতে এসেই আটকে যাচ্ছে। কোন মতেই সেগুলো
পূর্ণতা পাচ্ছে না। এরকম করতে করতেই হঠাৎ সে শুনতে পেল তার ঘরের দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে।
বড় অদ্ভুত ব্যাপার, এত রাতে তো কেউ আসার কথা নয়। কারন, সৈকত একলা থাকে বাড়িতে। সে ভেতর
থেকে সাড়া দিল,
-“কে?”
- “আমি আসিফ।” দরজার বাইরে থেকে একটা ভারী গলায় উত্তরটা
এল।
গলাটা সৈকতের চেনা। কলেজ জীবনের পুরনো বন্ধু আসিফ। এক
সময়ে খুব ভালো বন্ধু ছিল। কিন্তু, পরবর্তীকালে, ব্যক্তিগত কারনে কলেজ ছাড়তে বাধ্য হয়।
সৈকত পরে অনেকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে কিন্তু, আসিফ সেই চেষ্টায় সঙ্গ দেয়নি।
প্রায় চারবছর পর হঠাৎ এত রাত্রে আসিফ যে এখানে আসবে সেটা সৈকত বুঝতে পারে নি। ধীরে
ধীরে সৈকত দরজার দিকে পা বাড়ালো।
দরজা খুলতেই সৈকত যেটা দেখলো, সেটার জন্যে একটুও তৈরি
ছিল না সে। একটা রক্তমাখা কাটারি নিয়ে আসিফ
দাড়িয়ে আছে দরজার সামনে। সৈকত কি করবে ভেবে কূল পেল না।
“কেমন আছিস সৈকত? আমায় ঢুকতে বলবি না? ”, জামা কাপড়ে লেগে
থাকা রক্ত তখনও ঘরের দরজার সামনে টায় জমা হচ্ছে।
সৈকত দরজা বন্ধ করার সাহস পেল না। ভয় পেয়ে পিছতেই চেয়ারে
ধাক্কা খেয়ে নীচে পড়ে গেল।
আসিফ তখন ঘরের ভেতরে ধীরে ধীরে ঢুকছে। ভিতরে ঢুকে, যে
চেয়ারে ধাক্কা লেগে সৈকত পড়ে গেছিল, সেটাই তুলে এনে সেটাতে বসলো।
সৈকত এর মুখ থেকে কথা যেন বেরোতেই চাইছে না। অসম্ভব ভাবে
তোতলাতে তোতলাতে, সে বলল, “এতদিন পর এভাবে, এসব কি? আর আমি কোথায় থাকি এখানে এসে তুই
জানলি কি করে? আর এত রক্ত কোথা থেকে এলো?”
-“সবটাই তো তোর জন্যে রে! ভেবেছিলাম কোনোদিন বোধয় আর দেখা
হবে না। কিন্তু, নাহ! সেই আমাদের আবার দেখা হয়ে গেল। তবে কি বলতো! বিশ্বাস কর, এর পেছনে
আমার একটুও হাত নেই। সবের মূলে হচ্ছে তুই আর তোর অলসতা। ” একটা বিচ্ছিরি কর্কশ গলাতে
এতোটা কথাগুলো আসিফ বলে গেল।
- “দিনের পর দিন আমাকে দিয়ে একের পর এক খুন করিয়ে যাচ্ছিস।
না বন্ধ করছিস, না আমায় মুক্তি দিচ্ছিস। সৈকত, বাড়ির চাপে কলেজের পড়া ছেড়ে আমি একটা
ছোট কাজ করি। সেখান থেকে টেনে নিয়ে এসে আমাকে তুই এসব করাচ্ছিস। কি পাচ্ছিস এসব করে?
আমি তো তোর কোন ক্ষতি করিনি সৈকত।”
এবার যেন সৈকত একটু সাহস পেল কথা বলার। মেঝে থেকে উঠে
একটু দূরে সরে বসল সে। কিন্তু, আসিফ যেগুলো বলল সেগুলোর কিছুই তখনও তার মাথায় ঢুকছিল
না। আসিফ কি বলছে, কেন বলছে কিছুই বুঝতে না পেরে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল বেশ কিছুক্ষন।
ইতিমধ্যেই দরজা থেকে অন্তরা কখন ঢুকে এসেছে সৈকত খেয়াল
করেনি। পেটে ছুরি ঢোকানো, সাদা সালোয়ার কামিজ টা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। অন্তরা ধীরে ধীরে
ওর দিকে হেঁটে এসে এসে ওর সামনে নিচু হয়ে বলল,
“আমায় কেন খুন করেছিলি সৈকত? চার বছরের ভালোবাসা কে, পেছন
থেকে ছুরি মেরে পাহাড়ের খাদে ধাক্কা দিয়ে কেন ফেলেছিলি আমায়? কি দোষ ছিল? শুধু, আমি
তোর অফিসে চলা গোপন প্রেম ধরে ফেলেছিলাম আর মা কে বলে দেবো বলে? বল? উত্তর দে? কি দোষ
ছিল আমার।”
এতক্ষন সৈকত ভেবেছিল, আসিফ এর সাথে কথা গুলো বলবে, কিন্তু
অন্তরা এসে আবার ঘেঁটে দিল সবকিছু। এবার ওর মাথা ভীষণ রকমের যন্ত্রণা হতে লাগলো। কিছু
বুঝতে পারছিল না কি হচ্ছে। পাশের টেবিলে দুদিনের পুরনো স্কচ এর বোতল থেকে কিছুটা গ্লাসে
ঢালা ছিল, সেটা এক নিশ্বাসে খেয়ে গ্লাস রাখতেই দেখতে পেল, আসিফ আর অন্তরা ওর দিকে হেঁটে
আসছে। এক পা, এক পা করে ওরা যত এগোচ্ছে, সৈকত তত পিছোচ্ছে। ধীরে ধীরে সৈকত পেছতে পেছতে
পড়ার টেবিলে ধাক্কা খেয়ে চেয়ারে বসে পড়লো। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না। কোথায় যাবে?!
সেই সময়ে টেবিলে রাখা ফোন টা খুব জোরে বেজে উঠলো………
ঘুম ভাঙলো সৈকতের। আসলে কি লিখবে ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়েই
পড়েছিল। চোখটা ভালো করে কচলাতে কচলাতে ফোন দেখলো। মায়ের ফোন। সকাল থেকে কথা হয় নি।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলো রাত এগারোটা। মা কে ফোন করলো। কথা বলতে বলতে তার চোখটা
গেল ল্যাপটপের স্ক্রিনে। সেখানে একটা জিনিস দেখে সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না। কারন,
সেখানে সে লিখে রেখেছিল কোন কোন গল্প এখনো সে আধখানা লিখে ফেলে রেখেছে আর দীর্ঘদিন
হয়ে গেছে সেগুলো নিয়ে আর সে বসছেও না। এবার তার সামনে সব পরিষ্কার। এখনো পর্যন্ত দুটো
গল্প সে মাঝখানে ফেলে রেখেছে। আর তার মধ্যেই চরিত্র হিসেবে একটাতে সে আসিফ নামের একজনকে
দিয়ে দিনের পর দিন খুন করিয়ে যাচ্ছে। আরেকটাতে, অন্তরা নামের একটা চরিত্র কে পাহাড়ের
ধারে নিয়ে গিয়ে ছুরি মেরে পাহাড় থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল সে। সেখানেই বন্ধ। তারপর
আর লেখাগুলো নিয়ে এগোনো হয় নি তার।
ফেলে রাখা ফাইল টা ক্লিক করে সবে খুলতে যাবে। হঠাৎ, দরজা
তে টোকা পড়লো দু’বার। আসতে নয়, সজরে। সৈকত কাঁপাকাঁপা গলায় জিগ্যেস করলো’
-
“ক! কে?”
-
“মুকুন্দ গো দাদাবাবু! রাত হয়ে গেল! খেতে
আসো নি বলে ডাকতে এলুম।”
সৈকত যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। ল্যাপটপ টা বন্ধ করতে করতে ভাবলো, নতুন যে গল্পটা ভেবেছিল ওটা পরে নিয়ে বসবে। খেয়ে এসে আগে পুরনো লেখা গুলো শেষ করবে আগে। কোনোকিছুই আর সে পেন্ডিং রাখবে না সে।

Comments
Post a Comment