মায়াবিনী || Bengai Short Story ||
মায়াবিনী
দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন সকালে মুখার্জীবাড়ির দালানে মেয়েটাকে বসতে
দেখেছিল রুদ্র। আগে কখনো দেখেনি মেয়েটাকে। হয়তো কোনো অতিথি হয়তো, পুজোর জন্যে
এসেছে। মেয়েটাকে বেশ ভালো লাগলো রুদ্রের। বলা ভালো, মেয়েটার হাসিটার জন্যেই ভালো
লাগা। কারন, মেয়েটা হাসলে মেয়েটার গালে একটা অদ্ভুত ধরনের টোল পড়ে। খুব মিষ্টি সেই
হাসিতে ফাঁসি হয়ে গেল শ্রীযুক্ত রুদ্রনীল ধর।

রুদ্রনীল কোলকাতার এক নামী কলেজে পড়াশুনা করে। বাবার অনেক টাকা কিন্তু, তাতে
তার কোনো টান নেই। খুব ভালো ছেলে। বাবা-মায়ের খুব আদরের। পড়াশুনোতেও ভালো।
তা, মেয়েটাকে দেখে পাশে দাঁড়ানো বন্ধুকে জিগ্যেস করল,
-“মেয়েটা কে রে?”
-“কোন মেয়েটা? এখানে তো অনেক মেয়েই দেখা যাচ্ছে।”
-“আরে ওই যে, হলুদ শাড়ি পরে দুর্গামণ্ডপে বসে আছে।”
-“কোথায়?! ও আচ্ছা, পিয়ালি! পিয়ালি মুখার্জী। ”
-“আগে তো ওকে কখনো এবাড়িতে দেখিনি। ”
-“দেখার কথাও নয়। কারন, ও মামাবাড়িতে থাকে আর বাড়িতে খুব কম আসে। আর তাছাড়া তুই
ওর এত খবর নিচ্ছিস কেন? দেখ, অন্য কোনো মতলবে আমি নেই ভাই। ওর বাবা খুব জাঁদরেল লোক
সেটা তুই ভালো করেই জানিস। মেয়ের জন্যে খুন করতেও রাজি সে লোক। তাই, ওই মেয়ের ব্যাপারে
যদি কিছু ভুল করেও ভেবে থাকিস তাহলে, তা ভুল ভেবে ভুলে যা।”
-“তুই থাম তো, তোকে অত কিছু বলতে বলিনি। তবে, মা দুর্গা যদি চায় কাল আমি জোড়ায়
অঞ্জলি দেবো।”
দুপুরবেলা রুদ্র বাড়ি গিয়ে কোনোরকমে একটু খেয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে সোশ্যাল
সাইটে মেয়েটাকে খুঁজতে লাগলো। প্রোফাইলে সেই মায়াবী হাসি দেখেই বুঝে গেল এই সেই। অথচ,
মেয়েটাকে তখনও পর্যন্ত সামনা-সামনি দেখলো না। অনেক খুঁজল ফটো। কিন্তু, সব ফটোই শুধু
অর্ধেক। সবই একই ভাবে তোলা। রিকুয়েস্ট পাঠানোর ৫মিনিটের মধ্যেই একসেপ্ট করে নিল পিয়ালি।
রুদ্রের তখন অবস্থা ছিল দেখার মতো। কথা বলবে, কি বলবে না ভাবতে ভাবতেই ওদিক থেকেই একটা
ওয়েভ এল। রুদ্রও ভার্চুয়ালি ওয়েভ করলো মানে হাত ছোঁয়াল এই যা। আবার একটু পরে যে ম্যাসেজ
টা এলো, সেটা বোধয় রুদ্র কখনো আশাও করেনি। সেটা ছিল,
“হঠাৎ করেই চলে গেলেন কেন?”
‘মানে কি, তার মানে ওদিকেও কিছু চলেছে আমাকে নিয়ে?!’, রুদ্র ভেবে নিল। সাথে সাথে
অজিত কে ফোন করে পুরো ব্যাপারটা জানালো। অজিত শুধু এটুকুই বলল, “ভাই, তাহলে এবারের
পুজোতে তোর ভাগ্য তাহলে খুলে গেল।”
ফোন রেখে আরও বেশ কিছুক্ষন আলাপচারিতা চলল পিয়ালি আর রুদ্রের মধ্যে। ওদের কথাবার্তা
যে প্রথমদিনেই যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল তারপর রাত পের করে দেবে সেটা টের পায়নি কেউই। শেষে
রুদ্র এটুকুই বলল,
“কাল তাহলে, একসাথে পাশাপাশি অঞ্জলি দিচ্ছি তো।”
ওদিক থেকে উত্তর এলো,
“দিতেই পারি যদি তুমি হলুদ পাঞ্জাবি পরে আসো।”
রুদ্র নিজে নিজেই হেসে লিখলো আর পাঠিয়ে দিল,
“ঠিক আছে।”
পরের দিন অষ্টমী, যথারীতি তাড়াতাড়ি স্নান করে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি পরে তৈরি হয়ে
গেল রুদ্র। আজ একটু তাড়াহুড়ো টা বেশিই করছে। কিন্তু, বেচারার এমন দুর্ভাগ্য যার জন্যে
করছে, তার শুধু মাত্র হাসি টুকু ছাড়া আর কিছুই দেখেনি। সামনা সামনি কখনো দাঁড়ায়নি মেয়েটার।
অথচ তার সাথেই আজ নাকি সে অঞ্জলি দেবে। সবই যেন মায়া লাগছে তার কাছে।
শুভ কাজ কখনো যে
তাড়াহুড়ো তে করতে নেই সেটা বোধয় জানতো না রুদ্র। পাঞ্জাবি ঠিক করতে করতেই রীতিমত
জোরে জোরেই হাঁটছিল সে। মুখার্জীদের বাড়ির সামনে আসতেই দেখতে পেল সেই মেয়েটা পেছন
দিক করে দাঁড়িয়ে কারোর সাথে কথা বলছে রুদ্র থমকে গেল। এই জন্যেই ওকে আজ হলুদ
পাঞ্জাবি পরতে বলেছিল!কারন সে আজ, লালরঙের একটা শাড়ি পরেছে। মুখে একটা হালকা হাসি
নিয়ে দালানের দিকে এগোতে লাগলো রুদ্র।
হঠাৎ করেই কি মনে করলো, দালান পেরিয়ে নিচে নামার ধাপের সামনে এসে ‘পিয়ালি’ বলে
দূর থেকে ডেকে উঠল আর নিচের দিকে না তাকিয়েই এগোতে লাগলো।
ব্যাস! যা হওয়ার হয়ে গেল!! যখন চোখ খুলল দেখে, বিছানা থেকে নিচে পড়ে আছে সে।
আর সামনে তার মা তার পড়ার টেবিল গোছাতে গোছাতে বলছে,
“এই অষ্টমীর দিনেই তোকে বিছানা থেকে পড়তে হল তাও আবার কে না কে পিয়ালি’র নাম
নিয়েই। পারিনা বাবা তোদের নিয়ে। ছাড়, যা গিয়ে তৈরি হয়ে নে। মুখার্জীদের বাড়ির অঞ্জলি শুরু হয়ে যাবে
একটু পরে। তোর আলমারি তে রাখা হলুদ পাঞ্জাবিটা পরিস। ”
রুদ্র মাথা চুলকোতে চুলকোতে মেঝে থেকে উঠে বসলো আর ভাবলো,
‘হলুদ পাঞ্জাবি, মুখার্জীদের বাড়ির, যাহ্! স্বপ্ন ছিল ?!...............কোনো
মানে হয়!! ধুসস!!’
Comments
Post a Comment