স্পর্শ || Bengali Short Story ||

স্পর্শ

                              -শুভম বেরা


পরীক্ষা শেষ হতেই রোজের মতো তাড়াতাড়ি রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে এলো বিশাখা। স্বভাবতই, পরীক্ষার শেষদিনেও সৌমিক এসেছিল বিশাখা’র সাথে দেখা করতে। সৌমিক কলেজের কাছেই থাকে, একটা মেসে; কিন্তু, পরশু বাড়ি ফিরে যাবে বলে বিশাখাকে কথা দিয়েছে যে আজ সে তার সাথে তাকে বাড়ি পর্যন্ত ছাড়তে যাবে। সৌমিক বিশাখার থেকে দু’বছরের বড় হলেও বিশাখার ফার্স্ট ইয়ার আর সৌমিকের সেকেন্ড। সে যাই হোক, আজ সে প্রথম বিশাখার সাথে এতোটা সময় একসাথে থাকবে এটা ভাবতেই ওর একটা আলাদা অনুভুতি কাজ করছিল।

অনেকদিন আগে, সৌমিক বিশাখার কাছে একটা বাজিতে হেরে যায় এবং ওকে বলে যে, ও ওকে একটা জিনিস গিফট করবে। কিন্তু, বিশাখা বলে যে, সৌমিকের নাকি সাহস নেই সেটা গিফট করার। সৌমিক তো জেদ ধরেই বসে কিন্তু, ওরও সাহসে কুলোয় না। তো সৌমিক স্থির করে যেদিন ওকে বাড়িতে ছাড়তে যাবে সেদিনই ওকে ওটা দিয়ে দেবে।

কলেজ থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে থাকে চৌরাস্তার দিকে। যেতে যেতে চলতে থাকে নানান কথা, পরীক্ষা কেমন হল? আজ সকালে কি খেয়েছে? এইসব যা হয় আর কি! একটা নতুন সম্পর্কে।

অটো স্ট্যান্ডেও আজ একটু বেশিই ভিড়। চার পাঁচটা অটো ছাড়ার পর দুজনে একটা অটো পেলো। অটোটা যেন আজ একটু ধীরেই চলছে। বিশাখার খোলা চুলটা বারবার সৌমিকের মুখে এসে লাগছে।

“সরি, আসলে সকাল থেকে বাঁধা ছিল! আচ্ছা আমি বেঁধে নিচ্ছি”

সৌমিকের মৃদু স্বরে উত্তর, “থাক, তুই বাইরের দিকে তাকা !” বলে নিজেই চোখ বন্ধ করে বিশাখার দিকে আরও একটু সিটিয়ে বসলো।

কখন যে বিধাননগর চলে আসে, খেয়াল করতে পারেনি সৌমিক। অগত্যা, অটোওয়ালা কে তার পাওনা মিটিয়ে দুজনেই সাবওয়ে ধরে হাঁটতে থাকে ট্রেন ধরবে বলে। ঘড়িতে তখন সোয়া ছ’টা। আপের ট্রেন গুলো আজ একটু বেশিই ভিড়, বিশাখা’র কথায়। সৌমিক এ ব্যপারে কিছুই জানে না। তাছাড়া, কোলকাতার রাস্তাঘাটে খুব একটা বেরোয়ও না কিন্তু, আজকে কোনোকিছু উপেক্ষা করতে পারেনি। অচেনা একটা জায়গায় শুধু বিশাখার জন্যেই আজ সে যাবে।

“নাহ! এরকম হলে ট্রেন পাওয়া মুশকিল। এক কাজ করি, চলো শিয়ালদহ চলে যাই তারপর ওখান থেকে নৈহাটি লোকাল ধরে চলে যাবো।”, বিশাখা বলল।

“আমার এ ব্যপারে কোনও ধারনা নেই। তুমি যেভাবে পারবে চলো শুধু দেখো সময়টা যেন একটু বেশি পাই।”, সৌমিক তখন শুধুই বিশাখা ছাড়া পুরো পৃথিবী, বসুন্ধরা কিছুই চেনে না।

বিশাখা একটা ছোট্ট শয়তানি হাসি দিয়ে ট্রেনে উঠলো সাথে সৌমিকও।

এই প্রথমবার দুজনে এতোটা কাছাকাছি। ট্রেনের প্রায় শেষের কামরায় দুজন। প্রথমে একটু দূরত্ব রেখেই বসছিল তারা। কিন্তু, শিয়ালদহ যাওয়ার পর ফেরার সময় বেশ কয়েকজন প্রবীণ যাত্রীর গুঁতো-গুঁতি তে একদম সিটিয়ে বসেছে তারা। ট্রেন চলতে শুরু করেছে। ঘড়িতে তখন সাড়ে ছ’টার একটু বেশি। ট্রেন চলছে, ট্রেনের বাইরে পুরো অন্ধকার। হঠাৎ করেই, সৌমিক বিশাখার মাথার পেছন হাত বাড়িয়ে জানালার রেলিংটা ধরলো। বিশাখার একটা হাত তখন রেলিং ধরে আছে। হঠাৎ করেই কামরার আলো নিভে গেলো, পুরো ট্রেন তখন শুধুই রহস্যময় আর সৌমিকের হাত তখন আসতে করেই ধরে রাখলো বিশাখা। সৌমিকের কি মনে হল, আসতে করে নিজের মাথাটা বিশাখার কাঁধে রাখলো, বিশাখাও বুঝতে পেরে নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে রাখলো সৌমিকের মাথার ওপর।

এই প্রথম সৌমিক তার বিশাখার এতো কাছাকাছি। তারা এর আগে এতোটা সংস্পর্শে কখনও আসেনি। আজ তাদের মধ্যে এতটুকুও দূরত্ব নেই। সৌমিক আবারও ভেবেছে গিফটটা ওকে এখন দেবে নাকি; তবুও সামনের সিটে বসে থাকা একটি লোক হা করে ওদের দুজনকে দেখেই যাচ্ছে। তাই সৌমিক সাহস করে আর দিলো না গিফট টা।

বিশাখার ষ্টেশন আর একটু পরেই, কি যেন একটা কঠিন নাম!! তো, সৌমিক আর বিশাখা ট্রেন থেকে নেমে উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে এগোতে লাগলো। মজার কথা, সৌমিক এই প্রথমবার টিকিট ছাড়াই ট্রেনে চড়ছে। একটা ভয় যেমন কাজ করছে মনের ভেতর, তেমন একটা আলাদা ভালোলাগাও আছে।

ফুটব্রিজে উঠে সৌমিক কিছুক্ষণ দাঁড়ালো, তারপর ১নং প্ল্যাটফর্মে নেমে গেল বিশাখার হাত ধরে। চলে যেতে হবে এবার। প্ল্যাটফর্মের ঘড়িতে তখন ৭টা বেজে ৪০মিনিট। একের পর এক ট্রেন মিস করছে সৌমিক, বিশাখা বুঝতে পারছেনা সৌমিক এর কাণ্ড। এতো ট্রেন মিস করার কারন কি! হঠাৎ সৌমিক বিশাখার হাত ধরে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে বলল,

“শোন না! আমার কিছু বলার আছে। ”

“তো বলো! কে বারন করছে?!”

“না মানে! বলছি দাঁড়া না! এতো ব্যস্ততা কিসের?!”

“আরে রাত হয়েছে বাড়ি ফিরতে হবে তোমায়! তাড়াতাড়ি বলো।”

“বলছি। মানে, এটা খুব সিরিয়াস একটা বিষয়। কানে কানে বলতে হবে।”

“দুজনেই তো আছি......।। আর কে শুন......”

“আহ! শোন না। হ্যাঁ দুজনে থাকলেও কানে কানেই বলতে হবে।”

“ঠিক আছে বলো।”

এরপরে আরোও মিনিট পাঁচেকের মতো সময় নিয়ে সৌমিক বিশাখার কাছে গেলো। বিশাখার মুখের সামনে চলে আসা চুল গুলো আসতে করে সরিয়ে কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে ওর গালে........................... ছোট্ট একটা স্পর্শ।।



(পাশ থেকে সশব্দে চলে গেল একটা থ্রু ট্রেন......)

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

পেন্ডিং || Bengali Short Story ||

ইন্টারভিউ || Bengali Short Story ||

আইকার্ড (এক অসমাপ্ত প্রেমের গল্প) || Bengali short story ||