অন্য বসন্ত || Bengali Short Story ||

অন্য বসন্ত
          - শুভম বেরা
রাতের খাবার টা খেয়ে রীতম দোতলার ঘরে এসে টেবিলে বসলো। ঘড়িতে প্রায় এগারোটা বাজে। আর কিছুক্ষন পরেই ভ্যালেন্টাইনস ডে। রীতমের জীবনে একটা বিশেষ দিন হতে চলেছে আজ। টেবিলে বসে, সামনে খুলে রাখা ল্যাপটপে, তানিয়ার ছবিগুলো দেখছিল সে।

তানিয়া চ্যাটার্জি। হঠাৎ করেই একটা দু’বছরের সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পরে যখন রীতম ভেঙ্গে পড়েছিল। তখনই উদয় হয় এই তানিয়ার। ফেসবুক থেকেই আলাপ। বাড়ি কোচবিহার। আসলে, রীতম নিজেই রিকোয়েস্ট টা পাঠিয়ে ছিল। তার বেশ কয়েকমাস পরে কথা শুরু হয়েছিল ওদের। তানিয়া বয়সে বড়। বেশি না ওই আট মাসের মত। কিন্তু, তাতে কি?! ভালো বন্ধুত্ব কোনদিন বয়স দেখে হয়েছে?  ভালোই কথা চলছিল ওদের। তানিয়ার একটা অতীত আছে। যাক গে, সেসব বলতে গেলে এটা আর গল্প থাকবে না বরঞ্চ উপন্যাস হয়ে যাবে। তার থেকে বরং রীতম আর তানিয়ার কথা বলি।

কলেজ শেষ করে সদ্য তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় চাকরী পাওয়া কলকাতার রীতম চৌধুরী বর্তমানে ব্যাঙ্গালর নিবাসী। সব ঠিকঠাক চলছিল, হঠাৎ করেই কিরকম যেন ভেঙ্গে গেল সবটা। একটা বিশ্রী কারনে ২ বছরের সম্পর্কটা গত জন্মদিনের দিন ভেঙ্গে গেল। একটুও কাঁদেনি সে, একফোঁটাও না। যদিও শেষদিকে সম্পর্কটা অতিরিক্ত তিক্ত হয়ে যাওয়ার জন্যেই রীতম আর হাল ধরে নি। ছেড়ে দিয়েছিল সে।

রীতম আমাদের মতো হলেও কি হবে, ও একটু বেশি বোঝে। বেশি যত্ন নেয়। অতিরিক্ত ভালোবাসে নিজের থেকেও। কিন্তু, সেই ভালোবাসাতে আঘাত করলে হয়তো কিছু বলবে না কিন্তু, ওর কান্নাটা তারাই বোঝে, ওর চুপ করে যাওয়াটা তারাই বোঝে, যারা ওকে খুব কাছ থেকে চেনে। শুধু একজনই আছে যে দুদিনের মধ্যেই বুঝে গেছিল রীতমকে। যেদিন রীতম জানতে পারে তানিয়া ওর থেকে বড়, এতটাই গুমরে গেছিল যে, বাইরের জগৎ থেকে কিছু সময়ের জন্যে পুরো নিখোঁজ হয়ে গেছিল। তারপরে অবশ্য ঠিক হয়ে যায়। আসলে ওই যে বললাম না, ছেলেটা ভালোবাসার কাঙাল। নিজে সবাইকে প্রচণ্ড ভালোবাসে আর নিজেও চায় ওকেও সবাই ভালবাসুক।

তো যেটা বলছিলাম, ল্যাপটপে তানিয়ার ফটো দেখতে দেখতে এক মনে হেসে যাচ্ছে রীতম। এরকমই একটা ভালোবাসার সপ্তাহে ওদের আলাপ হয়। রীতম বেশ ভয়ে ভয়ে কথা শুরু করেছিল। অবশ্য এর পেছনে একজনের বড় হাত ছিল সেটা না হয় এই গল্পের একদম শেষে গিয়ে বলবো।

ল্যাপটপে ফটো দেখতে দেখতে হঠাৎ স্ক্রিনের কোনে নোটিফিকেশন এল।

“কি করছিস ?”

“এই তো, সবে খেয়ে এই ওপরে এলাম।” রীতম যতটা দ্রুত পারলো রিপ্লাই দিল।

“কালকের কি প্ল্যান ?”

“কি আর! এই অফিস যাবো সকালে। ক্লাইন্টের একটা নতুন আবদার আছে। ওটা মেটাতে হবে।”

“বাবাহ! তুই ওই কর। ক্লাইন্টের আবদারই মেটা। জানিনা কবে আসবি এখানে। দু’বছর হতে চলল। আজ অবধি দেখাই হল না আমাদের। আমরা নাকি আবার বন্ধু। ”

“আরে, এরকম করছিস কেন। ধৈর্য ধর। ঠিক দেখা হবে। ”

“ব্যাং হবে।”

“বলছি শোন না, তুই এখনো পাটুলিতেই আছিস তো নাকি? নাকি বাড়ি পালটেছিস।”

“না! কোথায় আর যাবো। ওখানেই আছি। কেন বলতো ?”

“না এমনি, অনেকদিন তোকে কিছু গিফট করা হয় নি, তার ওপর এই ঢপের সপ্তাহ, তাতে আবার তুই সিঙ্গেল। তাই ভাবছিলাম 
যদি কিছু দান করা যায় তোরে। হাহাহা!!”

“এক মারবো থাপ্পড়। যতই আমরা ভালো বন্ধু হই না কেন। ভুলে যাস না আমি কিন্তু বড়।”

“সে তো নিক জোনাস আর প্রিয়াঙ্কা ও আছে। তাতে কি? শোন, সম্পর্কে বন্ধুত্ত, বিশ্বাস, সম্মান আর ভালোবাসাটাই আসল। কাকে বলছি আমি! একটা অব্যবহৃত ব্রেন নিয়ে ঘোরা মাথামোটা মহিলা। একে দেখে নাকি আমি উল্টে গেছিলাম তাও আবার আমার ওই অবস্থার পরেও। এখন বমি হয়ে যায়। ওয়াক!!”

“দেখ রীতম, বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু। ধুর তুই ঘুমো, আমি আর পারছি না। ঘুম পাচ্ছে কাল কথা হবে। ঘুমোতে গেলাম।”

“তবে তাই হোক। মেইন ক্যাম্ফ টা একটু বাকি আছে। ওটা শেষ করি।”

“ওই লোকটার মধ্যে যে কি আছে বুঝি না। একটা বাজে লোক ।”

“একটা মানুষ এত সহজে একটা গোটা বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়ে ফেলল। তাকে কি এত সহজে অবহেলা করা যায় তানিয়া চ্যাটার্জি?”

“উফ! আবার শুরু করলো। এই ঘুমোতে যা, কাল সকালে অফিস আছে। যা ভাগ।”

“ঠিক আছে। অগত্যা শুভ রাত্রি। ঘুমিয়ে যা।”
  
পরের দিন সকালে তানিয়ার ঘুম ভাঙল দরজার আওয়াজে। কেউ যেন খুব ধীরে অথচ জোরে জোরে দরজায় আওয়াজ করছে। তানিয়া কলকাতাতে একাই থাকে। অত সকালে কে আসবে এসব ভাবনা চিন্তা করতে করতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ছিটকিনিটা নামিয়ে দরজা টা খুলতেই যেন ভিরমি খেল সে। মুখে কোনো কথা নেই। হঠাৎ করেই তার গলার স্বর যেন কেউ কেড়ে নিয়েছে মনে হচ্ছিল তার। প্রায় দুমিনিট মত চারিদিকটা নিস্তব্ধ। মৌনতা ভাঙল রীতমের গলার আওয়াজে। আজ দুজন দুজনকে প্রথম সামনাসামনি দেখছে। হাতের গোলাপের গোছা তানিয়ার হাতে ধরিয়ে দিয়েই বলে উঠলো,

                       “সত্য হে অনাদি সত্য কথা কও। চুপ করে থেকো না…কথা কও।”


Comments

Popular posts from this blog

পেন্ডিং || Bengali Short Story ||

ইন্টারভিউ || Bengali Short Story ||

আইকার্ড (এক অসমাপ্ত প্রেমের গল্প) || Bengali short story ||