শেষ দেখা || Bengali Short Story ||


শেষ দেখা

-          শুভম বেরা

মুখ থেকে বিয়ারের বোতল টা নামিয়ে পাশে রেখে অমিত বলল,

“তাহলে, তুই  শুনবি না ? ”

“হচ্ছে না আমার দ্বারা আর।” কথা টা বলেই তৃতীয় বোতলের বিয়ারের শেষটুকু এক দমে খেয়ে নিল লাবন্য।

“কিন্তু লাবন্য, তুই তো বড়। তুই অন্তত বোঝ। ”

“কি বুঝবো বল?! একটা মানুষ দিনের পর দিন আমার সাথে এরকম করে যাবে আমি সব টা মেনে নেব? ”

“কিন্তু, তুই হাল কেন ছাড়ছিস? এত পুরনো একটা সম্পর্ক। এতদিন যখন পেরেছিস সারাজীবন পারবি তুই। একটু বিশ্বাস রাখ। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“ঠিক আছে দেখবো ক্ষণ। ছাড় বাদ দে তুই। ” কথা টা বলেই, চতুর্থ বোতলটা খুলতে বসলো লাবণ্য।

অমিত তখন আরেক ঢোক খেয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে রইল।

শেষের কবিতা’র অমিত আর লাবন্যের থেকে কিন্তু, কলকাতার বালিগঞ্জের লাবন্য আর পার্ক সার্কাসের অমিত এর কাহিনীটা বেশ আলাদা। লাবন্য আর অমিত এর আলাপ কি ভাবে হয়েছিল সেটা আজও ওরা জানায় নি। পার্ক সার্কাসে বাড়ি হলেও অমিত থাকে সিঙ্গাপুরে। একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে রয়েছে। এতদিন ভারতেই ছিল। এক বছর হল সিঙ্গাপুরে আছে। আর লাবন্য বরাবরই বালিগঞ্জের। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে গত তিন-চার বছর দেখছি ওদের একসাথে। এবারেও ছুটি নিয়ে অমিত বাড়ি এসে লাবন্যর সাথে দেখা করতে এসেছে। বাড়ি এলে একটা পুরো দিন লাবণ্যর সাথে থাকা চাই। ঐদিন লাবন্যও কাউকে চেনে না। সারাদিন অমিত এর সাথে ঘুরে বেড়াবে। তারপর সারারাত নিজের বাড়ির ছাদে বসে বিয়ার সহযোগে সমস্যা সমাধান।

লাবন্য প্রেম করে। ফেসবুক থেকে আলাপ হয়েছিল ছেলেটার সাথে। অমিত যেটুকু আমায় বলেছিল তাতে, ছেলেটার বাড়িও নাকি বালিগঞ্জে। তবে, প্রথম প্রথম সব ঠিক থাকলেও এখন কিরকম যেন ভেঙ্গে যাচ্ছে সবটা। লাবন্যের অনেক সমস্যা তাকে নিয়ে। তবুও লাবন্য সম্পর্কটাকে ধরে রেখেছে শুধু অমিত ভরসা জুগিয়ে যায়, যে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু, লাবন্য কোথাও যেন অমিত এর প্রতি একটু বেশি নির্ভরশীল। অমিত থাকলে যেন ওর মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু, কিছুই ঠিক হয় না। কারন, সূর্যের সাথে লাবন্য অমিতকে কথা বলতে দেয় না। ও বলা হল না, লাবন্য যাকে ভালোবাসে সেই ছেলেটার নাম সূর্য। সূর্য মুখার্জি।

“এই অমিত, সেদিন তুই কি যেন একটা বলেছিলি রাত্রে।”, লাবন্য হঠাৎ করে কথাটা বলে অমিত এর দিকে তাকালো।

একটা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে গেল তখনই। অমিত ওর দিকে চোখের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

“কই কিছু না তো! তুই সেদিন থেকেই মাঝে মধ্যে এটা নিয়ে বসে পড়িস। এক জিনিস বারবার বলতে ভালো লাগে না লাবন্য। ওটা ভুলে যা, কিছুই না ওটা।”, অমিত একটু যেন গম্ভীর ভাবে কথা গুলো বলল।

“তুই তাহলে বলবি না তো। ” লাবন্য প্রশ্ন করলো।

“আরে বাবাহ! বলছি তো, সেদিন একটু বেশি চড়ে গেছিল তাই কি বলতে কি বলে ফেলেছি।” অমিত একটু আটকে আটকে কথা গুলো বলল।

“না এবার উঠি বুঝলি। কাল আবার ফিরবো তো। সকালে একটা কাজ আছে ওটা সেরে তারপর বেরিয়ে যাবো।”, অমিত মেঝে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো এটা বলে।

লাবন্য ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “এ কি এক্ষুনি উঠে পড়লি? আর কাল কাজ আছে মানে? আমি তো তোকে বললাম যে, কাল আমি দুপুরে খাবার বানাবো একসাথে খাবো।”

“আরে খাবো তো! তার আগে একটু কাজ আছে। চলে আসবো ঠিক।” অমিত বলল।

" বাবাহ্!! আজকাল আমাকেও বলা যায় না কি এমন কাজ থাকে। হুহ!!” লাবন্য ওর দিকে না তাকিয়েই কথা টা বলল।

অমিত লাবন্যের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “পৃথিবীতে যাই হয়ে যাক। শুধু একটা কথাই মনে রাখবি, হাল ছেড়ো না বন্ধু।”

“আর যদি আমরা আলাদা হয়ে যাই। আমাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ”

“তাহলে বুঝবো, তুই অবশেষে সুখে আছিস। আর সেটাই আমি দেখতে চাই। তোকে খুশি দেখতে চাই। আর পরের জন্মে অপেক্ষা করবো।”

-          কথাটা বলে অমিত লাবন্যকে জড়িয়ে ধরলো। লাবণ্যও যেন অমিত কে খুব নিজের করে জড়িয়ে ধরল। সেই রাতের সাক্ষী অজস্র তারা আর একফালি চাঁদ। চাঁদের আলোটা যেন একদম ওদের ওপরেই পড়ছে। ওদের ভয় নেই কেউ দেখে ফেলার। আজ কতদিন পর লাবন্য আর অমিত এইভাবে দাড়িয়ে আছে। লাবন্য তার কাঁধে অমিতের নিশ্বাস অনুভব তো করছিলই তার সাথে কিছুটা ভেজা ভেজা লাগলো তার।

হঠাৎ লাবন্যের একটা কথায় অমিত কিছুটা ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েও লাবন্যের থেকে দূরে সরে গেল।

“ভালোবাসিস, এই কথাটা বলতে এত কষ্ট অমিত? শুধুই বন্ধুত্ত নষ্টের ভয় নাকি আমি সূর্যকে ভালোবাসি বলে।”

অমিত কিছুটা সরে গিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলতে পারলো না। তারপর সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকলো নিঃশব্দে।

“কাল তোর পছন্দের মালাইকারী বানাবো। ভুলে যাস না যেন।”

                                                                 --------------------

নাহ! পরের দিন অমিত আর আসেনি। সেই রাতের পর অমিত এর সাথে আর কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারেনি লাবন্য। অনেক চেষ্টা করেছে। অনেকভাবে। কিন্তু, লাভের লাভ কিছুই হয় নি। এরপর প্রায় বছরখানেক কেটে গেছে। লাবন্য বিয়েও করেছে সূর্যকে, আর কোনো বড় ঝামেলা হয়নি ওদের মধ্যে। এখনো মাঝে মধ্যে চেষ্টা করে কিন্তু, লাভ হয় না কিছু। সোশ্যাল মিডিয়াতে কোথাও কোনোরকম রিপ্লাই পায় না সে। একপ্রকার হাল সে ছাড়তে বাধ্য হয়েছে কারন, একটাই রাগ। অমিতও তার কোনো খোঁজ রাখেনি। অবশ্য সে রাখেনি নাকি রাখতে চায়নি সেটা নিয়েও সন্দেহে লাবন্য। সে আজও জানে না সেদিন সকালে কি কাজ ছিল অমিত এর। জানে না কেন আসেনি সেদিন দুপুরে। এটাও জানে না। যাওয়ার আগে কেন তাকে বলে গেল না। শুধু ফ্লাইটে ওঠার আগে একটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কবিতা পাঠিয়েছিল। সেটাই অমিত এর লাবণ্যকে বলা শেষ কথা।
        
                                                            কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
                                                                    তারি রথ নিত্যই উধাও
                                                            জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন
                                                        চক্রে-পিষ্ট আধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
                                                                ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল
                                                        জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল-
                                                                       তুলে নিল দ্রুতরথে
                                                                    দুঃসাহসী ভ্রমনের পথে
                                                                       তোমা হতে বহুদুরে।
                                                                    মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে।
                                                                       পার হয়ে আসিলাম
                                                            আজি নবপ্রভাতের শিখরচুড়ায়
                                                                রথের চঞ্চলবেগ হাওয়ায় উড়ায়
                                                                       আমার পুরানো নাম।
                                                                    ফিরিবার পথ নাহি;
                                                                দূর হতে যদি দেখো চাহি
                                                               পারিবে না চিনিতে আমায়।
                                                                        হে বন্ধু বিদায় ।।
                                                                                                       ~ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


Comments

Popular posts from this blog

পেন্ডিং || Bengali Short Story ||

ইন্টারভিউ || Bengali Short Story ||

আইকার্ড (এক অসমাপ্ত প্রেমের গল্প) || Bengali short story ||