অস্তিত্ত্ব || Bengali Short Story ||
অস্তিত্ত্ব
- শুভম বেরা
জানলার ধারে ফুলদানিটা তখনও সূর্যের শেষবেলার আলোতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল খানিকটা দূর থেকেই। নিজের বানানো কফি'টাতে শেষ চুমুক দিয়েই সৌম্য, দিনের শেষ মেল টা লিখতে বসলো। বছরখানেক হল নতুন চাকরীতে জয়েন করেছে সে। আগের কোম্পানিতে ভালোই ছিল সবকিছু। তবে, ছেলে বলে, "এক জায়গায় বসে গেলে সেটাকে আর জীবন বলে না। জীবন হল, এগিয়ে যাওয়া। " তো, এই নতুন অফিসে প্রতিদিন কাজ শেষ করার আগে একটা করে মেল লিখতে হয় ম্যানেজার কে।
মেল'টা লেখার পর কি মনে হল, কোল থেকে বালিশটা পাশে রেখে বিছানার পাশে রাখা টেবিল থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ধরালো। একটা দু ওয়াটের বাল্ব জ্বলা ঘরের মধ্যে, সিলিং ফ্যানের একটা বিরক্তিকর আওয়াজ ছাড়া তখন আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। সেই আওয়াজ সহ্য করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই দেখে, সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ার চেষ্টা করলো যাতে বেশ কিছুটা দূর পর্যন্ত সেটা যায়।
সৌম্য মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে। পড়াশুনো তেও খুব একটা ভালো ছিল বলবো না, তবে কলেজের শেষদিকে যেটুকু করেছিল সেই সৌভাগ্যেই ওর চাকরীটা জুটে যায়। একজন সাধারন ছাত্র থেকে মাসে পঁচিশ হাজার টাকা আয় করার যাত্রাপথটা খুব একটা যে সহজ ছিল না, সেটা সৌম্য এখন ভালোই টের পায়। শেষ তিনবছরে অনেককিছু দেখে নিয়েছে সে। তার মনে হয়, আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে সে যদি মরেও যায় তা সত্ত্বেও, তার জীবন নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকবে না।
অফিসের চাপের কারনে, নতুন পড়া শুরু করা বইটাও বিছানায় পড়ে আছে আধ খোলা অবস্থায়। এমনকি, পরশু শুরু করা একটা সিনেমা ও একই দশা তে। কিছুই যেন ভালো লাগে না সৌম্যের আর। যদিও সে বুঝতে পারছে যে, তার জীবনটা এখন পুরোই যান্ত্রিক হয়ে গেছে, কিন্তু তার হাতে কিছুই নেই এটা পাল্টে ফেলার।
হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে উঠলো। কিন্তু, সৌম্যের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না। সে এক পায়ের ওপর আরেক পা রেখে, সিগারেটে আরও একটা টান দিয়ে আবার ফিরে গেল নিজের ভাবনার জগতে।
যে ছেলেটা সারাজীবন ঘরকুনো বলে পরিচিত ছিল। বাড়ির বাইরে কোথাও যেত না। বন্ধুবান্ধব এর সংখ্যাটাও নিমিত্তমাত্র। সেই ছেলে, আজ ছয়মাস হয়ে গেল বাড়ি যায় নি। মায়ের হাতের মশালাদার কষা মাংস থেকে ভুল করলে বাবার হাতের কষিয়ে বসানো চড়, আজ সবটাই স্মৃতি তার কাছে। আর বন্ধু বলতে, ঐ তো ঘণ্টাখানেক ভিডিওকল। এই ভিডিওকল ব্যাপারটা আলাদাই একটা সার্কাস লাগে সৌম্যের। যেন বেশ কিছু পায়রা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা কোটর থেকে একটা হাসি মুখ বের করে রেখেছে। প্রত্যেকেই দেখাতে চায় তারা কতটা সুখী। কতটা হাসিখুশি তাদের জীবন। যেন তারা কখনো কোনোদিন রেগে যায় নি। কিন্তু, ঐ কল শেষ করার কিছুক্ষণ পরেই আবার সবাই যে যার জগতে, একেবারে নিজের মতো। প্রতিটা হাসি মুখ কোথায় যেন আবার হারিয়ে যায় নিমেষের মধ্যেই।
হঠাৎ করেই সৌম্য হাত টা ছিটকে দিল। অজান্তেই কখন বুঝতে পারেনি, সিগারেটটা শেষ হয়ে গেছে। একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে ল্যাপটপটা আবার খুলল। ড্রাফটে পড়ে থাকা মেলটা আরেকবার ওপর থেকে দেখে নিয়ে, নীচে নামটা লিখে দিয়ে সশব্দে 'এন্টার' বোতাম টা টিপলো।
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে, নিজেই নিজেকে বলল,
" জর্জরিত জীবনের মায়াজাল বোঝার থেকে সিগারেটের ধোঁয়া দিয়ে কুণ্ডলী পাকানো ঢের সহজ। "

Comments
Post a Comment