সীট নং ২৫/বি || Bengali Short Story
সীট নং ২৫/বি
কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে গল্পের বইয়ের পাতা পাল্টাচ্ছিল মেহুল। প্রায় চারমাস ঘরবন্দি থাকার পরে আজ ফিরে যাওয়ার পালা নিজের দেশে। যখন চারমাস আগে বাড়ি ফিরেছিল দুই সপ্তাহের ছুটি কাটাবে বলে। ভাবতেও পারেনি সেই দু সপ্তাহ কোথা থেকে এতগুলো দিন হয়ে যাবে। সত্যিই পৃথিবী একটা অসুখে ভুগেছে বটে। কত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়েছে এই মারন রোগ তার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা আছে বলে মনে হয় না। জানি না, কত যুগ ধরে মানুষেরা এই ভাইরাস নিজের শরীরে বয়ে বেড়াবে। কিন্তু, তা বলে কি জন জীবন থেমে থাকবে? জীবন চলবে নিজের গতিতে। হয়তো ‘নিউ নর্মাল’ পদ্ধতিতে। এই শব্দটির সাথেও বাঙ্গালী পরিচিত হয়ে গেল বলে।
মেহুল ইউরোপে থাকে। প্রায় বছর দুয়েক হল, কর্মসূত্রে ইউরোপ নিবাসী এই ছেলে কিন্তু আজও দেশের টান ভোলে নি। বছরে একবার পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে আসা চাই। নাহলে নাকি ইউরোপে তার মন বসে না যদি বছরের শেষে হিসেব কষতে না বসে যদি দেশের উল্লেখ না থাকে। দেশে থেকেও ঐ দেশের খবর নিয়েছে সে। ইউরোপের অবস্থাও খুব শোচনীয়, রোজ খবরে দেখতো। কিন্তু, হাতে তো কিছুই করার নেই। তাই, আর পাঁচ জনের মতো সেও হাত কামড়াতো। এখন একটু অবস্থা ভালো হয়েছে শুনে, বাবা মা এর তীব্র আবেদন না শুনেই সেও ছুটেছে তার দেশে। যতই হোক, সেটাও তো তার নিজের।
লাউঞ্জে বসে পুরনো আধা একটা বই প্রায় শেষ করতে যাবে, এমন সময় শুনতে পেল তার নির্দিষ্ট প্লেনে ওঠার জন্যে চেক ইন শুরু হয়েছে। তাই যথারীতি, কাপ টা পাশের ডাস্টবিনে ফেলে ব্যাগ টা এক কাঁধে নিয়ে আর হাতে বইটা নিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
বোর্ডিং পাশ স্ক্যান করিয়ে যথারীতি এগিয়ে চলল মেহুল প্লেনের দিকে। প্লেনের গেটের সামনে দাড়িয়ে থাকা এয়ারহোস্টেস গুলোর দিকে এক পলক তাকিয়ে মাথাটা ওপর নিচে একবার ঝাঁকিয়ে নিজের সিটের দিকে এগিয়ে চলল মেহুল। এয়ারহোস্টেস’রা নিয়ম অনুযায়ী বোর্ডিং পাশ দেখে সবাইকে তাদের নির্দিষ্ট সীট দেখিয়ে দিয়ে সাহায্য করেন। কিন্তু, মেহুলের এতবার প্লেনে যাতায়াত হয়ে গেছে যে, ও চোখ বন্ধ করেই নিজের আসন অবধি চলে যেতে পারবে এমন অবস্থা। তো, স্বভাবতই সে এসবের তোয়াক্কা করে না। যথারীতি, নিজের সীটে বসে পিঠের ব্যাগ’টাকে পায়ের কাছে একটু চেপে ঢুকিয়ে রেখে হাঁসফাঁস করতে লাগলো সে। ‘নিউ নর্মাল’ পদ্ধতির জন্যে একে তার মুখে মাস্ক, তায় আবার চশমা। এমনিতেই বেশ কিছুক্ষন এই দুটো জিনিস একসাথে থাকলে কিছুক্ষন পরে অকাল-কুয়াশা তৈরি হয়ে যায়। তার ওপর আবার ফেসশিল্ড। এই তিনটে জিনিস সামলাতে গিয়ে একপ্রকার হিমশিম খেতে হচ্ছে মেহুল কে। কিন্তু কিছু করার নেই। এটাই এখন নর্মাল জীবন। অগত্যা একটু বেজার মুখ করে শিল্ড’টা উঠিয়ে ব্যাগ থেকে বোতল বের করে জল খেলো সে। প্লেনে তখন একে একে যাত্রীদের আগমন লেগেই রয়েছে। আর সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং ?! সেটা কি জিনিস ?! এক নামকরা রাজনৈতিক নেতার মতো করে যদি বলতে হয় তাহলে বলা যায়, “দারুন লজ্জার ব্যাপার।”
এইসব দেখতে দেখতেই ব্যাগ হাতড়ে কোনোরকমে নিজের আইপ্যাড বের করে ঠিক করে গুছিয়ে বসতে যাবে, এক মাঝবয়সী মহিলা (পিপিই কিট পরিহিতা অবশ্যই) মেহুল কে বিব্রত করে বলল,
- “ইজ ইট টুয়েন্টি ফাইভ বি?”
উনিশ ঘণ্টার যাত্রাপথে, পাশে একজন মেয়ে বসবে এইটা ভেবেই মেহুল একটা ইতস্তত হাসি হেসে মাথা নাড়ালো ইতিবাচক ভাবেই। তবে, ঐ যে ‘নতুন সাধারন’ পদ্ধতি মেনেই মেয়েটি পিপিই কিট পরিহিতা। কিন্তু, মেহুল ভাবছে। একটা মেয়ে এরকম্ সময়ে প্লেনের মাঝের সিট নিতে গেল কেন? এরকম তো কখন সে দেখেনি। হবে হয়তো, দেরি করে পৌঁছেছে আর বোর্ডিং পাশ নেওয়ার সময় যা সীট খালি ছিল সেখান থেকেই একটা ধরে দিয়ে দিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতেই নিজের ব্লু-টুথ হেডফোনটা কানে লাগিয়ে চোখ টা বন্ধ করলো।
চোখটা খুলল একটা ঝাঁকুনি তে। মেহুল পরিষ্কার শুনতে পেল ফ্লাইট ক্যাপ্টেনের গলা, নির্দেশ দিচ্ছেন অযথা শোরগোল না করার জন্যে। কারন, আবহাওয়া খারাপ থাকার কারনে এরূপ বেশ কিচ্ছুক্ষণ চলতে পারে। মেহুল একটু সোজা হয়ে বসে জানালা থেকে নীচের দিকে তাকালো। এমনিতেই অন্ধকার তারপরে আবার বেশ মেঘ হওয়ার কারনে তেমন কিছুই দেখতে পেল না সে।
হঠাৎ
পাশ থেকে শুনতে পেল,
- “আর ইউ গোয়িং টু দিল্লী ? ”
- “হ্যাঁ, তবে ঠিক দিল্লী না। দিল্লী হয়ে ইউরোপ।“ মেহুল মেয়েটির দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিল।
মেয়েটি বলল, “আচ্ছা বেশ!”
- “আপনি কদ্দুর?”, মেহুল মেয়েটির দিকে না তাকিয়েই কথাটা জিজ্ঞেস করলো।
- “কিভাবে বুঝলেন আমি বাঙ্গালী ? ”, মেয়েটি একটু বিস্ময়ের সাথে প্রশ্নটা করলো।
- “আসলে একটু আগে চোখে পড়লো, আপনার প্লে লিস্টে বেশ কয়েকটা বাংলা গান এবং তাঁর মধ্যে একটা আপনার কানে এই মুহূর্তে বেজে চলেছে। আর সেটা স্পষ্ট আপনার ফোনের স্ক্রিনে।”
- “আপনি অন্যের ফোনও চেক করেন নাকি ? ”
- “না আসলে, আপনি যদি অচেনা কারোর সাথে দুম করে কথা বলা শুরু করে দেন, তারওপর আবার পাশে বসে, স্বাভাবিক ভাবেই চোখ তো ফোনে পড়বেই।”
এযাবৎ যা কথা হল, মেহুল গুনে গুনে তিনবারও মেয়েটির দিকে তাকিয়েছে কিনা সন্দেহ। ঐ একবার কি দুবার হবে।
- “তা বললেন না আপনি কি দিল্লী নাকি দিল্লী থেকে……… ?? ”
এবার যে ঘটনাটা ঘটল, সেটার জন্যে মেহুল বোধয় তার আগে পর্যন্ত দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারে নি।
- “আইপ্যাড থেকে চোখটা সরিয়ে এদিকে তাকালে বুঝতে পারবে কেন প্রশ্নটা করলাম মেহুল সরকার । ”
গলার স্বরটা খুব চেনা ঠেকলো মেহুলের। মেহুল ঘুরে তাকালো। বুঝতে পারছে না ও যেটা ভাবছে সেটাই সত্যি হতে চলেছে কিনা।
মেয়েটি ফেসশিল্ড টা মাথার একটু ওপরে তুলে মুখের মাস্ক টা নীচে নামিয়ে হালকা আওয়াজে বলল,
- “অবাক হলে নাকি মেহুল ?”
মেহুল মেয়েটির দিকে তাকালো। কোথায় যেন দেখেছে। খুব চেনা চেনা ঠেকলো ওর।
- “নীহারিকা !!”
- “যাক অবশেষে চেনা গেল তাহলে? প্রায় তিন বছর ধরে ফেসবুকে কথা বলা তারপর হঠাৎ করেই হারিয়ে যাওয়া। একদিন অজান্তেই দেখলাম আনফ্রেন্ড ও করে দেওয়া হয়েছে। জানতে চাইনি কারন টা কি ছিল। আসলে জানার আর চেষ্টাই করিনি।”
মেহুল তখন একেবারে চুপ। কি বলবে ও কিছুই যেন বুঝতে পারলো না। হতভম্ভ হয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো, “কেমন আছো ? ”
- “ভালো! বেশ ভালো। তবে তার জন্যে তোমার অনেকটা ধন্যবাদ প্রাপ্য মেহুল। তুমি ভার্চুয়ালি এলেও, আমার লাইফটা অনেক বদলে দিয়েই চলে গেছিলে। তা তুমি কেমন আছো? আর এই সময়ে ইউরোপ কেন?
- “ ভালো লাগছিল না আর। ও হ্যাঁ, তোমাকে তো আর বলা হয় নি। আমি এখন ইউরোপেই থাকি। বাড়িতে এসেছিলাম ছুটি নিয়ে কিন্তু, এই করোনা পরিস্থিতির জন্যেই আটকে পড়েছিলাম। কিন্তু, যখন সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করলো আর মন বসছিল না এখানে। তাই ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু তুমি কেন? আর তাছাড়া, একদম মাঝের সীট? আগে থেকে সীট নিয়ে রাখো নি কেন?”
- “আসলে টিকিট বাবা কেটে দিয়েছিল। আর এয়ারপোর্টে আসতেও আজ একটু দেরি হয়েছিল তাই যা পেরেছে তাই দিয়ে দিয়েছে। তবে, জানি না ভগবান বলে সত্যি কিছু আছে কিনা। এই যে, দেখা করবো, দেখা করবো করে আমাদের কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল প্রায় বছরখানেক হতে চলল। আর আজ হঠাৎ করেই দেখা হয়ে গেল। ভাবতেই পারিনি তোমার সাথে এইভাবে প্রথম দেখা হবে!”
- “আর কি করবে! আমাদের জীবনে কার সাথে কখন দেখা হয়ে যায়, কার সাথে কখন সব কিছু শেষ হয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। শুরু হলে আমরা জানতেই পারি না এর শেষ কোথায়। যাক গে, বলো আদিত্য এর খবর কি?”
-
“ মনে আছে ?!”
-
“ না মনে রাখলে চলে!”
-
“ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে গত মাসে। ও বিয়ে করছে
অন্য একজন কে।”
-
“মানে! আর তুমি? ”
- “আমি চাকরী করি ও মানতে চায় নি। তাই ছেড়ে দিয়েছে। আর কথা বলেনি। কাল শুনলাম যে বিয়ে করছে অন্য কাউকে। আর আমার কাল থেকে নতুন চাকরী দিল্লী তে। যদিও অফিস যেতে হবে না। তবুও অফিস থেকে কোয়ার্টার দিচ্ছে ওখানেই থাকতে হবে তাই তো চলে যাচ্ছি। ”
আইপ্যাড এর দিকে তাকিয়ে হালকা ঘাড় নাড়িয়ে ধীর স্বরে বলল, “আচ্ছা!”
জানালার বাইরে থেকে নীচের দিকে দেখার চেষ্টা করলো মেহুল। মেঘের ফাঁক থেকে নীচের আলোকিত শহর একটু একটু করে দেখা যাচ্ছে। ফেসশিল্ডটা এবার একটু মাথার ওপরে তুলল। মাস্কটাও একটু নীচের দিকে নামিয়ে একটু নিশ্বাস নিয়ে নিল সে। হঠাৎ একটা প্রশ্ন তাকে আরও একবার বাধ্য করলো বিড়ম্বনা তে পড়তে। নীহারিকা জিজ্ঞেস করলো,
- “আনফ্রেন্ড করে যোগাযোগ বন্ধ কেন করেছিলে মেহুল?”
প্রশ্নটা শুনে থমকে গেল মেহুল। মনে পড়ে গেল পুরনো কিছু কথা আরেকবার। নীহারিকার সাথে হঠাৎ করেই একদিন রাত্রে ফেসবুকে আলাপ হয়েছিল এই মেহুলের। সত্যি বলতে, ভালো লেগেছিল মেহুলের। যদিও তখন সে বুঝতেই পারে নি এই মেয়েকেই একদিন ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বের করে দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। অনেককিছু মাথার মধ্যে ঘুরছিল সেদিন।
- “কি হল? বলতে চাও না নাকি বলার মতো কোনো ভাষা নেই?”
- “কি বলবো আর! ছাড়ো যা হওয়ার হয়ে গেছে। ওগুলো নিয়ে তো আর ঘেঁটে লাভ নেই আরও একবার। আমি ভালো আছি, তুমি ভালো আছো। এটুকুই অনেক। আর তাছাড়া, তোমার সুস্থ জীবনে তো খানিকটা ব্যস্ততা হয়েই ঢুকে গেছিলাম। তাই সেই জায়গাটা থেকে বেরনোর রাস্তা খুঁজছিলাম অনেক দিন ধরেই। আসলে, ভালোবেসে ফেলাটা অনেকটা অজান্তেই হয়ে গেছিল। কারন, অভ্যেস মানুষকে ভালবাসতে বাধ্য করে একটা সময় পরে গিয়ে। আর সেই ভুলটা আমি করে ফেলেছিলাম যেটা হয়তো উচিৎ ছিল না। কিন্তু, একদিন না একদিন তো বেরোতেই হত। নাহলে এই মোহে ডুবে থাকলে হয়তো দিনের শেষে কিছুই পেতাম না। তাই, সরে যাওয়াটাই শ্রেয় ছিল। ”
- এত কিছু ভেবে নিয়েছিলে আর একবারেও আমার সাথে এগুলো শেয়ার করার কথা মনে পড়েনি?
- “কিছু হত কি এগুলো বলে ? তার থেকে চুপচাপ সরে যাওয়া ভালো নয় কি? হ্যাঁ, আমি মানছি আমি বাড়াবাড়ি করেছি। কিন্তু, সত্যি বলতে আমি আর চাইনি নতুন করে কোনো অশান্তির মধ্যে জড়িয়ে পড়তে। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম কিভাবে সবটা করবো। আর একদিন, হঠাৎ করেই সুযোগ টা পেয়ে গেলাম।”
- “এখন তো তাহলে ভালোই আছো দেখছি।”
- “একদিন বলেই ছিলাম, আমার ভালো থাকার চাবি অনেক ভেবে আবার একটা ভুল হাতে দিতে গেছিলাম। নাহ, ভাগ্যিস দেইনি। নাহলে এবার বড়রকম মুখ থুবড়ে পড়তাম।”
হঠাৎ,
ফ্লাইট ক্যাপ্টেনের গলার আওয়াজটা পেলাম। দিল্লী পৌঁছে গেছি। ফ্লাইট ল্যান্ড করবে তাই
সবার নিরাপত্তা বেল্ট যাতে বেঁধে নেন।
- “আমরা কি বন্ধু থাকতে পারি না আর মেহুল?”
মেহুল কোনো উত্তর দিল না।
-
“অন্তত যোগাযোগ? নাকি সেটাও?......”
- “আমি এখানে এখন আর থাকি না নীহারিকা। আমি ভারত ছেড়ে বাইরে থাকি কারন, আমি চাই না দেশের কোনো পিছুটান নিয়ে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে। শান্তি চাই আমি জীবনে।”
হঠাৎ করেই নীহারিকা মেহুলের হাতটা ছুঁলো। আর ঠিক তক্ষুনি একটা ঝাঁকুনি অনুভব করলো মেহুল।
চোখটা খুলে দেখলো ফ্লাইটটা রান ওয়ের ওপর খুব দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। বুঝতে পারলো, ফ্লাইটটা ল্যান্ড করেছে। আর এতক্ষন যা যা তার সাথে ঘটেছে সবটাই তার স্বপ্নে।
হ্যাঁ, নীহারিকা বলে একটি মেয়েকে একসময় মেহুল ভালবাসতো। কিন্তু, সেই মুহ্রতে সীট নং ২৫/বি তে কোনো নীহারিকা ছিল না। নীহারিকা হয়তো এখনো তার মন থেকে যেতে পারে নি।

Comments
Post a Comment